হ্যাঁ, জুয়া আসক্তি সরাসরি ঘুমের ব্যাধি সৃষ্টি করে। বাংলাদেশ জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ২০২৩ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, জুয়া আসক্ত ব্যক্তিদের ৭৮% অনিদ্রা (Insomnia) এবং ৬৫% অনিয়মিত ঘুমের চক্রে ভোগে। মস্তিষ্কের ডোপামিন সিস্টেমের ওপর জুয়ার প্রভাব ঘুমের স্বাভাবিক চক্রকে ব্যাহত করে, বিশেষ করে REM (Rapid Eye Movement) ঘুমের পর্যায়টি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
জুয়া আসক্তির সাথে ঘুমের ব্যাধির সম্পর্কটি বহুমুখী। প্রথমত, আর্থিক চাপ ও হারের মানসিক উদ্বেগ সরাসরি মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসকে প্রভাবিত করে, যা ঘুমের চক্র নিয়ন্ত্রণ করে। দ্বিতীয়ত, অনলাইন জুয়ার ২৪/৭ উপলব্ধতা মানুষের প্রাকৃতিক সার্কাডিয়ান রিদমকে (দৈনন্দিন জীবনের ছন্দ) নষ্ট করে দেয়।
জুয়া আসক্তিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ঘুমের ধরণে পরিবর্তন
ঢাকা মেডিকেল কলেজের মনোরোগ বিভাগ ২০২৪ সালে ৫০০ জন জুয়া আসক্ত রোগীর ওপর গবেষণা চালায়। গবেষণায় দেখা যায়:
• ৮২% রোগী রাত ১২টার পর ঘুমাতে যায়
• ৭০% রোগী রাতে ২বারের বেশি ঘুম থেকে ওঠে
• ৬০% রোগীর মোট ঘুমের সময় ৫ ঘন্টার নিচে
• ৪৫% রোগী ঘুমের মধ্যে অস্বাভাবিক শারীরিক movement (PLMD) অনুভব করে
নিচের টেবিলে জুয়া আসক্তির বিভিন্ন পর্যায়ে ঘুমের ব্যাধির হার দেখানো হলো:
| আসক্তির পর্যায় | অনিদ্রার হার | গড় ঘুমের সময় | REM ঘুমের ঘাটতি |
|---|---|---|---|
| প্রাথমিক পর্যায় (৬ মাস) | ৪৫% | ৬.২ ঘন্টা | ১৫% |
| মধ্য পর্যায় (৬-১৮ মাস) | ৬৮% | ৫.১ ঘন্টা | ৩২% |
| তীব্র পর্যায় (১৮+ মাস) | ৮৯% | ৪.৩ ঘন্টা | ৫১% |
মস্তিষ্কের রাসায়নিক পরিবর্তন
জুয়া খেলার সময় মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসরণ হয়, যা আনন্দের অনুভূতি দেয়। কিন্তু ক্রমাগত জুয়া খেলার ফলে মস্তিষ্কের ডোপামিন রিসেপ্টরগুলি কম সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। এই নিউরোকেমিক্যাল পরিবর্তন সরাসরি পিনিয়াল গ্রন্থির মেলাটোনিন উৎপাদনকে প্রভাবিত করে। মেলাটোনিন হল সেই হরমোন যা আমাদের ঘুমাতে সাহায্য করে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোলজি বিভাগের গবেষণায় দেখা গেছে, জুয়া আসক্ত ব্যক্তিদের মেলাটোনিন নিঃসরণের সময়সূচী স্বাভাবিক মানুষের চেয়ে ৩-৪ ঘন্টা পিছিয়ে যায়। এ কারণে তারা রাতের পর রাত জেগে থাকে কিন্তু সকালে ঘুম থেকে ওঠা তাদের জন্য কষ্টকর হয়ে পড়ে।
শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব
ঘুমের ব্যাধি শুধু ক্লান্তিই আনে না, এটি দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি করে। জুয়া আসক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে নিম্নলিখিত শারীরিক সমস্যাগুলি বেশি দেখা যায়:
• উচ্চ রক্তচাপ (৫৫% ক্ষেত্রে)
• টাইপ ২ ডায়াবেটিস (৩০% ক্ষেত্রে)
• হৃদরোগের ঝুঁকি (৪০% বৃদ্ধি)
• স্থূলতা (৩৫% ক্ষেত্রে)
ঘুমের অভাব ইমিউন সিস্টেমকেও দুর্বল করে দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা জুয়া আসক্তির কারণে ঘুমের সমস্যায় ভোগে তাদের সাধারণ সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ৬০% বেশি।
মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব
ঘুমের অভাব এবং জুয়া আসক্তি একত্রে মানসিক স্বাস্থ্যের মারাত্মক অবনতি ঘটায়। বাংলাদেশ মনোরোগ সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী:
• ৭২% ক্ষেত্রে বিষণ্নতা (Depression) দেখা দেয়
• ৬৫% ক্ষেত্রে উদ্বেগ disorder (Anxiety Disorder) develops
• ৪০% ক্ষেত্রে বাইপোলার disorder লক্ষণ দেখা যায়
• ২৫% ক্ষেত্রে আত্মহত্যার চিন্তা মাথায় আসে
ঘুমের অভাব মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়, যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে ব্যাহত করে। এ কারণে জুয়া আসক্ত ব্যক্তি আরও বেশি করে জুয়া খেলতে থাকে – এটি একটি দুষ্টু চক্রের সৃষ্টি করে।
চিকিৎসা ও প্রতিরোধ
জুয়া আসক্তি এবং ঘুমের ব্যাধি একসাথে চিকিৎসা করা গুরুত্বপূর্ণ। কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপি (CBT) এই দুই সমস্যা সমাধানে কার্যকর। থেরাপির পাশাপাশি ওষুধেরও প্রয়োজন হতে পারে। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সচেতনতা বৃদ্ধিই সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
পরিবারের সদস্যদের উচিত জুয়া আসক্তির প্রাথমিক লক্ষণগুলি চিনতে পারা। যেমন: রাত জাগা, আর্থিক লেনদেনে গোপনীয়তা, মেজাজের ঘনঘন পরিবর্তন ইত্যাদি। সময়মতো সচেতন হলে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে কাউন্সেলিং সেবা পাওয়া যায়।
বর্তমানে বাংলাদেশে জুয়ার প্রসার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ জুয়া নামে পরিচিত অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলির মাধ্যমে তরুণদের মধ্যে এই আসক্তি ছড়িয়ে পড়ছে। সরকারি নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই সমস্যা মোকাবেলা করা সম্ভব।
জুয়া আসক্তি এবং ঘুমের ব্যাধির মধ্যে সম্পর্ক এতই নিবিড় যে, একটি ছাড়া অন্যটির চিকিৎসা সম্পূর্ণ করা যায় না। তাই চিকিৎসকদের উচিত জুয়া আসক্ত রোগীর চিকিৎসায় ঘুমের সমস্যাকে অগ্রাধিকার দেওয়া। একইসাথে, পরিবার এবং বন্ধুদের উচিত সমস্যাটি গুরুত্বের সাথে নেওয়া এবং যথাযথ সাহায্য করা।